বাংলাদেশের নিচু অঞ্চলগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন চাষযোগ্য জমি প্রতিনিয়ত তলিয়ে যাচ্ছে, তখন কৃষকরা তাদের পূর্বপুরুষদের শত বছরের পুরনো এক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন ভাসমান সবজি চাষ। একে স্থানীয়ভাবে ‘ধাপ চাষ’ বলা হয়। মূলত গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও পিরোজপুর জেলায় এই পদ্ধতির প্রচলন সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় কৃষকেরা কচুরিপানা,টেপাপোনা, শেওলা, দুলালি লতা, নারিকেলের ছোবলা ও মাটি দিয়ে ভাসমান বিছানা (বেড) তৈরি করে তার ওপর বিভিন্ন ছোবড়া দিয়ে স্তরে স্তরে তৈরি মাটিবিহীন ভাসমান বেডে সারা বছর ফসল ফলান। এই ভেলাগুলো পানির উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে ভাসতে থাকে, ফলে বন্যায় ফসল নষ্ট হয় না। এখানে মাটি ছাড়াই ঢেড়স, করলা, বেগুন ও বিভিন্ন শাকসবজি অনায়াসেই ফলানো যায়। এতে বাড়তি সারের প্রয়োজন হয় না এবং এই পদ্ধতি অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
২০১৫ সালে এফএও (FAO) এই পদ্ধতিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি সম্পূর্ণ কীটনাশক ও রাসায়নিক সারমুক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি জলমগ্ন হওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। বাংলাদেশ সরকার এই পদ্ধতিকে দেশের হাওর ও অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি মূলত জলাবদ্ধ ও পতিত জমিকে চাষযোগ্য করার মাধ্যমে কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং ভূমিহীন কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ দেখাচ্ছে।

Post a Comment